এ ধর্ষণ কি শুধুই আসিফার, না কি আমার, আপনার, সবার ?

আজকাল আমাদের প্রতিটা সকাল শুরু হয় কোনো না কোনো নারীর সম্মান হারানোর খবর দিয়ে। প্রতিটা ধর্ষিত শিশু, বোন আর মায়েদের আহাজারিতে শুরু হয় নতুন একটা দিনের। কিন্তু কেন? ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছিলাম “মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য”। তবে কি এই প্রবাদগুলো মিথ্যে? না আমরা মিথ্যে? না আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি?

গত কয়েকদিন আগের ঘটনা। কাশ্মীরে ৮ বছরের শিশু কন্যা আসিফাকে একটি মন্দিরের ভিতরে টানা ৮ দিন আটকে রেখে গণ ধর্ষণ করা হয়েছে। এরপরে তার হাত পা ভেঙ্গে ইঁট দিয়ে আঘাত করে নির্মমভাবে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে তার ক্ষতবিক্ষত শরীর। কি দোষ ছিলো তার? একটা মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়াটাই কি সবচেয়ে বড় ভুল? যদি ভুল হয়ে থাকে তবে আমাদের মা- বোনেরাও মেয়ে হয়ে জন্ম নিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছে। কারণ একজন মায়ের জন্ম না হলে জন্ম হতো না এক একটা ধর্ষকের। আসিফাকে কারা ধর্ষণ করেছে? মন্দিরের দুজন কর্মকর্তা আর দুজন পুলিশ অফিসার। খুব জানতে ইচ্ছে করে এই চারটে মানুষের মা কিংবা বোন যখন একটা ছোট্ট শিশুকে ধর্ষণের অপরাধের কথাটা জানতে পারে তখন তাদের মনের অবস্থা কেমন ছিলো। তাদের মা আর বোনেরাও তাদের কাছে নিরাপদ নয়। যারা মাত্র ৮ বছরের একটা শিশুকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলতে পারে তাদের কাছে পৃথিবীর কোন নারীই নিরাপদ নয়।

ছোটবেলায় আমাদের স্কুলমুখী করা হয়। কারণ আমাদের পরিবার বিশ্বাস করে স্কুল গিয়ে একটা সত্যিকারের মানুষ হতে পারবো আমরা। কিন্তু আসলেই কি আমরা পেরেছি মানুষ হতে? মন্দিরে যায় মানুষ ধর্মের কথা শুনতে,ঈশ্বরকে জানতে, ঈশ্বরের উপাসনা করতে। কিন্তু যখন মন্দিরের ধর্মগুরুরায় একটা বাচ্চা মেয়ের সম্মান কেড়ে নিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করে তাকে, তখন বলতেই হয় তাদের বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় ভুল ছিলো এমন ছেলের জন্ম দেওয়া।

বলুন তো শেষ কবে আমরা ধর্ষণের খবর ছাড়া দুটো দিন কাটিয়েছি? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন ব্যাপার। আমাদের পুরো পৃথিবীটা ধর্ষকে ভরে গেছে। প্রতিনিয়ত আমাদেরই আসে পাশে নানা মুখোশের আড়ালে হেঁটে বেড়াচ্ছে এক একটা ধর্ষক। তবে এরা তো কেউ আকাশ থেকে পরে নি,সবাই মায়ের পেট থেকেই এসেছে। দশটা মাস মা কষ্ট সহ্য করে গর্ভে ধারণ করে,নিদারুন প্রসব যন্ত্রনা সহ্য করে জন্ম দিয়েছেন এই সব ধর্ষকদের।একজন নারীর শরীর থেকে জন্ম নিয়ে আর একজন নারীর সম্মান কেড়ে নেয় এইসব মুখোশধারী নরপিশাচের দল।এরপর হয়তো এমন একটা দিন আসবে যে মা হওয়াটা নারীর কাছে আনন্দের নয় আতঙ্কের হয়ে উঠবে।

Image result for asifa murder case

এভাবে আর কতদিন? আর ৮ বছরের শিশু আসিফা প্রাণ হারিয়েছে। কাল আমাদের নিজের মা- বোন এই অত্যাচারের শিকার হবে না যে এর নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে?একটা মেয়ের শরীরে অত্যাচার চালনোর আগে কি একবারও মনে পড়ে না আমার মায়ের শরীরটাও তাদের মতন? আমার নিজের মা যদি এমন অত্যাচারের শিকার হয় তবে সেটা সহ্য করার ক্ষমতা আমার আছে কি?

ধরে নিই,আপনি একটা ছেলে,বাসে করে যাচ্ছেন। পুরো বাসে কেবল আপনি একাই ছেলে। বাকি সব মেয়ে। এমনকি বাসের ড্রাইভারটাও মেয়ে। একটু নির্জন রাস্তা দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ করেই বাসটা থেমে গেল। পুরো বাসের ১৫-২০ টা মেয়ে একসাথে আপনাকে আঘাত করতে শুরু করলো।একজন একজন করে সবাই আপনার শরীরে অত্যাচার করলো। ধারালো ছুরি দিয়ে শরীরের প্রতিটা অংশে আঘাত করে শেষ মুহূর্তে সবাই মিলে পৈশাচিক ভাবে হত্যা করলো আপনাকে।এমন অবস্থা হয়েছে যে আপনার মৃতদেহ দেখে বোঝার উপায় নেই এটা আপনি। পরিবারের সদস্যেরাও আপনাকে দেখে চিনতে পারছে না।আপনাকে সনাক্ত করতে কয়েক ধরণের টেস্ট করানোর প্রয়োজন পড়লো। তারপর সেই ক্ষত-বিক্ষত মরদেহটা আপনার বাবা-মা’র কাছে পৌঁছে দেয়া হল। একটাবার চিন্তা করে দেখুন তো আপনার পরিবারের অবস্থাটা এখন ঠিক কেমন?

‘নারী’ এমন একটা শব্দ যেখানে লুকিয়ে থাকে পুরো একটা পরিবারকে একা হাতে সামলে নেয়ার ক্ষমতা। যেখানে লুকিয়ে থাকে পরিবারের সব সদস্যের জন্য অপরিসীম ভালোবাসা,যত্ন, মায়া। যেখানে লুকিয়ে থাকে একজন মেয়ে থেকে মা হয়ে ওঠার গল্প। একজন নারীর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সম্মান। আর আমরা তাদের সেই সম্মানটাকেই কেড়ে নিয়ে পুরো পৃথিবীর কাছে তার ক্ষত-বিক্ষত মরদেহের ছবি তুলে উপস্থাপন করছি। আমাদের সমাজে ধর্ষকরা বুক ফুলিয়ে হাঁটে। কেবল লজ্জায় মরে যায় একজন ধর্ষিতা আর তার পরিবার।

আর কতদিন মানুষের মুখোশ পড়ে নরপশু হয়ে বাঁচবো?প্রতিবাদের নামে সোশ্যাল মিডিয়াতে নিজের প্রোফাইল পিকচার কালো করে আর মোমবাতি নিয়ে মিছিলে হাঁটলেই কি মানুষ হওয়ার পরিচয় দেওয়া যায়?ধর্ষিতা কে করুনা করা বন্ধ করুন বরং ছিঁড়ে ফেলুন আপনার আশেপাশে ঘুরেবেড়ানো এইরকম নরপিশাচদের মুখোশ। মানুষ শব্দটাই আজ বিলুপ্তির পথ ধরেছে অমানুষদের ভীড়ে। আমরাই সৃষ্টি করেছি মানুষ শব্দের একটা বিপরীত শব্দ। দিনশেষে একটা করে মানুষ কমে যাচ্ছে আর বেড়ে যাচ্ছে অমানুষের সংখ্যাটা।

জোর করে যদি ভালোবাসা আর নরম শরীর পাওয়া যেতো তবে সম্রাট শাহজাহান মমতাজকে ভালোবেসে তাজহল সৃষ্টি করতেন না। তিনিও তবে ধর্ষকদের খাতায় নাম লিখাতেন। একটা মেয়ের মন জয় করে নিতে হয় ভালোবাসা দিয়ে। নারীজাতিরা কেবল ভালোবাসার কাজেই পরাজিত। আর পৃথিবীর কোন শক্তিই তাদের হার মানাতে পারে না। একটা সত্যিকারের মানুষ হয়ে মেয়েদের সামনে দাঁড়ালে তখন তারাই আপনার প্রাপ্য ভালোবাসা দিয়ে আপনাকে কাছে টেনে নিবে। মেয়েরা মায়ের জাতি। একটা মেয়ের প্রাণ কেড়ে নেয়ার অর্থ হলো পৃথিবী একটা মা’কে হারালো। আজ ৮ বছরের যে শিশুটাকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হল,তার ভিতরেও লুকিয়ে ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বীজ।

এখনও যদি আমরা জেগে না উঠি,ঘুরে না দাঁড়ায়,প্রতিবাদটাকে সোশ্যাল মিডিয়া আর মিছিলে আটকে না রেখে বাস্তব জীবনেও আসে পাশে ঘটতে থাকা এইধরণের ঘটনার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায়,নারীকে অসম্মান করার জন্য ওঠা ছোট ছোট হাত গুলোকে গুঁড়িয়ে না দিই,বিশ্বাস করুন আসিফা,নির্ভয়াদের সাথে সাথে আমাদের সমস্ত মানবজাতিটায় একদিন হারিয়ে যাবে।কারণ সৃষ্টি করার ক্ষমতা যার আছে সেই পারে সমূলে বিনাশ করতে।

Tags:

or

Log in with your credentials

Forgot your details?