হলদিয়ায় দশম বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসব ২০১৮

শ্যামল সেন: কবিদের কাছে,কবিতার কাছে আমি গভীরভাবে  ঋণী। আমার দুর্ভাগ্য সৃজনকর্তা আমাকে কবিতা লেখার ক্ষমতা দেননি। কবিতা,গান,শিল্পকলা সৃষ্টি শুধু কাগজ কলম দিয়ে হয় না,তুলি দিয়ে হয় না,গলা সাধলেও হয় না। এই ক্ষমতা সৃজনকর্তা দিয়েই পাঠান। হলদিয়ায় বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসবের মঞ্চে এমনই আক্ষেপ যশস্বী কথা সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের। তিনি বললেন,কবিতা উৎসবে এপার বাংলা,ওপার বাংলা ও প্রবাসী কবিদের চাঁদের হাট বসেছে। রসিকতা করলেন,এখানে আমাকে ‘এক্কবারে মানাইছে নাইরে’। শীর্ষেন্দুর স্বীকারোক্তি,কবিতা আমি লিখিনা বটে,তবে কবিতার আমি খুব ভক্ত পাঠক।

তমালিকা পন্ডাশেঠের স্মৃতিতে সত্যিই এবার হলদিয়ায় দশম বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসব ২০১৮তে কবি সাহিত্যিকদের চাঁদের হাট বসেছিল। ২৭জানুয়ারি শনিবার সেই উৎসবের উদ্বোধনে এসে নিজের কবিসত্ত্বাকে আড়াল করে রাখতে পারেননি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল শ্রী কেশরীনাথ ত্রিপাঠীও। প্রথামাফিক উদ্বোধনের পর রাজ্যপাল তাঁর পাশে বসে থাকা উৎসবের প্রাণপুরুষ লক্ষ্মণ শেঠকে বলেন,আমি বাংলা কবিতা শুনব।

এরপর কবি তমালিকা পন্ডাশেঠের ‘ধূলি থেকে তুলে নাও পাপ’ কবিতাটি পাঠ করেন তাঁর বোন শিক্ষিকা শুচিস্মিতা মিশ্র। কবিতায় মুগ্ধ হন রাজ্যপাল। তিনি সঙ্গে করে এনেছিলেন নিজের কবিতার বই। সেখান থেকে দুটি স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন স্বয়ং রাজ্যপাল। হাততালিতে ফেটে পড়ে কবিতা প্রাঙ্গণ। রাজ্যপাল বলেন,বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা বিশ্বের বাংলাভাষী মানুষের মেলবন্ধন ঘটেছে। একই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পারস্পরিক সৌভ্রাতৃত্বের বার্তা দিচ্ছে এই উৎসব।

হলদিয়ার সংবাদ সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকা ও আইকেয়ার সংস্থার যৌথ  উদ্যোগে রানীচক সংলগ্ন নলেজ সিটির মেরিন কলেজ ক্যাম্পাসে কবি তমালিকা পন্ডাশেঠের স্মৃতিতে অনুষ্ঠিত হল তিন দিনের বিশ্ব বাংলা কবিতা উৎসব। উৎসবের উদ্বোধন করেন রাজ্যপাল। এছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ,বাংলাদেশের প্রাক্তন সংসদ সদস্য ও কবি ফজলুর রহমান খান ফারুক,কবি নরুল হুদা,কবি প্রণব চট্টোপাধ্যায়,প্রাক্তন সংসদ সদস্য লক্ষ্মণ শেঠ,উৎসবের সভাপতি নলিনী বেরা ও সম্পাদক কবি শ্যামলকান্তি দাশ প্রমুখ।

সকন্ঠে রাজ্যপালের কবিতাপাঠ ও বুদ্ধদেব গুহর অসাধারণ গায়কীতে নিধুবাবুর টপ্পা গানের মেলবন্ধনে উদ্বোধনেই উৎসবের সুর বাঁধা হয়ে যায়। বুদ্ধদেব গুহ বললেন,তমালিকাকে ভালবেসেই উৎসবে পশ্চিমবঙ্গ,বর্হিবঙ্গ ও বাংলাদেশের এত কবি ও সাহিত্যিক উপস্থিত হয়েছেন,এটাই উৎসবের সার্থকতা।

উৎসব প্রাঙ্গণে প্রায় চারশো মিটার রঙিন রঙ্গোলী আল্পনা এঁকে বর্ণময় করে তোলেন হলদিয়া ইন্সটিটিউট অব হেল্থ সায়েন্সের শিক্ষক ও পড়ুয়ারা। কলেজের শিক্ষক শঙ্খশুভ্র পাত্রের নেতৃত্বে ৩০জন প্যারা মেডিকেল পড়ুয়া তিনদিন রাত জেগে অক্লান্ত পরিশ্রম করে এই আল্পনা আঁকেন।

কবিতা,উপন্যাস,গল্প সহ বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ধারার এমন নানা দিকবদল নিয়ে আলোচনায় জমজমাট ছিল এবারের কবিতা উৎসব। কবিতা পাঠ,আবৃত্তি,কবিতার গান,লোকগান ছাড়াও ‘বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতা’,‘সমাজ জীবনে ভারতীয় দর্শনের প্রভাব’ ও ‘সোশ্যাল মিডিয়া কি সাহিত্যকে গ্রাস করছে?’ এই তিনটি বিষয় নিয়ে আলোচনা সভা হয়। সভাগুলিতে উপস্থিত ছিলেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়,সাংবাদিক সম্পাদক সুমন চট্টোপাধ্যায়,সামানন্দ মহারাজ,প্রশান্ত প্রামাণিক,প্রাক্তন সংসদ সদস্য লক্ষ্মণ শেঠ,সাহিত্যিক দেবেশ রায়,লেখিকা আয়েশা খাতুন,কবি সৈয়দ কওসর জামাল প্রমুখ।

উদ্বোধনের দিন বিকালে ‘বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতা’ বিষয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় মুখ্য আলোচক ছিলেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়,এই সময় পত্রিকার সম্পাদক সাংবাদিক সুমন চট্টোপাধ্যায় এবং লক্ষ্মণ শেঠ। দিকপাল সাংবাদিক সুমনবাবু তাঁর দীর্ঘ আলোচনায় প্রযুক্তির উন্নয়নের সন্ধিক্ষণে সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,সাহিত্যের অনুষঙ্গেই সংবাদের সংকট মুক্তির পথ খুঁজতে হবে।

অন্য একটি আলোচনা সভায় বাংলার আর এক যশস্বী সাহিত্যিক দেবেশ রায় বলেন,বাংলা উপন্যাসের ধারা বদলে গিয়েছে,আর কেউ আগের মত ঢঙে উপন্যাস লিখে চলতে পারবে না। সেই উপন্যাসগুলিতে বাংলা ও ঝাড়খন্ডের জঙ্গলমহল এলাকার এমন কোন জায়গার নাম নেই,যেখানকার মানুষের কথা উঠে আসেনি।

‘সোশ্যাল মিডিয়া কি সাহিত্যকে গ্রাস করছে?’ এই আলোচনায় লক্ষ্মণ শেঠ বলেন,সোশ্যাল মিডিয়া প্রযুক্তির উন্নয়নের একটি ধারা। তাকে অস্বীকার করে তার সঙ্গে কবিতা সাহিত্যের সংঘাট ডেকে এনে আখেরে লাভ হবে না আমাদের। প্রযুক্তি ও মানবিক অনুভূতির মেলবন্ধন ঘটানো প্রয়োজন মানবসভ্যতার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য।

এবার কবিতা উৎসবে ৩০জন বাংলাদেশের কবি সাহিত্যিক এসেছিলেন। দুই বাংলা শুধু নয়,ভারত বাংলাদেশ মৈত্রী স্থাপনেও এই সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উৎসবের শেষ দিন অর্থাৎ ২৯জানুয়ারি মঞ্চে দুই বাংলার কবি সাহিত্যিক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের স্মৃতি জাগরুক করে রাখতে উপহার ও স্মারক বিনিময় হয়। সেখানে উদ্যোক্তাদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মণ শেঠ,শ্যামলকান্তি দাস,নলিনী বেরা,আশিস মিশ্র,আপনজন পত্রিকার সম্পাদক সুদীপ্তন শেঠ,প্রকাশক সায়ন্তন শেঠ,কমল বিষয়ী,বাংলাদেশের কবি সালেম সুলেরি,সন্তোষকুমার ঢালী,আসলাম সানী প্রমুখ। উৎসবের আতিথেয়তায় কবিরা মুগ্ধ।

উৎসব সভাপতি সাহিত্যিক নলিনী বেরা বলেন,এবার কবিতা উৎসবে পশ্চিমবঙ্গ,বহির্বঙ্গ ও বাংলাদেশ মিলিয়ে প্রায় চারশো জন কবি,সাহিত্যক,ছড়াকার,গল্পকার ও শিল্পী উপস্থিত ছিলেন। আমেরিকা,আসাম,ত্রিপুরা,মেঘালয়,অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে প্রবাসী বাংলাভাষী কবিরা এসেছিলেন। বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন ৩০জন কবি সাহিত্যিক। এই উৎসব বস্তুত তিনবঙ্গের বাংলা কবিতা মিলন উৎসব হয়ে উঠেছিল। এবার কবিতা উৎসবের আকর্ষণ ছিল লিটলম্যাগাজিন মেলা।এবার উৎসবে ‘আপনজন স্মারক সম্মাননা ২০১৮’ দেওয়া হয় সৃজন লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক লক্ষ্মণ কর্মকার,ক্ষুদ্র সংবাদপত্র শিল্পবন্দরের সম্পাদক বীরেন্দ্রনাথ মাইতি,কবি নিতাই জানা এবং গল্পকার ও জাতীয় শিক্ষক মঙ্গলপ্রসাদ মাইতিকে।

or

Log in with your credentials

Forgot your details?